বর্তমান বিশ্বে বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে যে ব্যাপক উন্মাদনা সৃষ্টি হয়, তা অনেক ক্ষেত্রেই একটি সাধারণ খেলার সীমা অতিক্রম করে সমাজে গভীর ফিতনা, সময়ের অপচয় এবং নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১. ফরজ ইবাদত ও দায়িত্বের চরম অবহেলা
বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালে সমাজের একটি অংশ
রাত জেগে খেলা দেখায়, যার ফলে ফজর নামাজ জামাআতের সাথে আদায় করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে নামাজ একেবারেই ছুটে যায়।একইভাবে অন্যান্য ফরজ ও ওয়াজিব দায়িত্বে গাফেলতি দেখা দেয়, ঘুম ও সময়ের স্বাভাবিক শৃঙ্খলা নষ্ট হয় এবং দৈনন্দিন পারিবারিক ও পেশাগত দায়িত্বে অবহেলা সৃষ্টি হয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে নামাজ এমন একটি ইবাদত, যা কোনো অবস্থাতেই গাফলতি বা অগ্রাহ্য করার বিষয় নয়। অথচ বিনোদনের একটি মাধ্যমকে কেন্দ্র করে যদি ফরজ ইবাদতে অবহেলা ঘটে, তবে তা একজন মুসলিমের জন্য গভীর চিন্তার বিষয়।
২. অর্থনৈতিক অপচয়, ভোগবাদ ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয়
বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে অনেকেই টিভি, প্রজেক্টর, বড় স্ক্রিন, আড্ডা, সাজসজ্জা ও বিভিন্ন ধরনের উদযাপনে বিপুল অর্থ ব্যয় করে থাকেন। বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রয়োজনীয় পারিবারিক খরচ সংকুচিত করেও এই ধরনের আয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
ইসলাম অপচয়কে কঠোরভাবে নিন্দা করেছে এবং অপচয়কারীদের শয়তানের অনুসারী হিসেবে উল্লেখ করেছে। এ অবস্থায় অপ্রয়োজনীয় বিনোদন ও আড়ম্বরপূর্ণ উদযাপনে অর্থ ব্যয় করা নাজায়েয।
৩. শিক্ষা ও কর্মজীবনে শৃঙ্খলার অবনতি
বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ নিয়মিত ক্লাসে অনুপস্থিত থাকে, পাঠে মনোযোগ হারায় এবং পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বিঘ্ন ঘটে। একইভাবে কর্মজীবীদের ক্ষেত্রেও উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়, কর্মঘণ্টা অপচয় হয় এবং সামগ্রিকভাবে জাতীয় অর্থনীতিতে পরোক্ষ ক্ষতির সৃষ্টি হয়।
এটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত গাফেলতির বিষয় নয়; বরং একটি সামষ্টিক সামাজিক সমস্যা, যা শিক্ষা ও কর্মসংস্কৃতির শৃঙ্খলার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
৪. পতিতাবৃত্তি, যৌন ফিতনা ও অশ্লীলতার ভয়াবহ বিস্তার
বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশে যে পরিবেশ সৃষ্টি হয়, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিভিন্ন পর্যবেক্ষণমূলক প্রতিবেদনে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে যে, বড় ক্রীড়া আসরগুলোতে যৌন ব্যবসা, মানবপাচার এবং যৌন শোষণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। পর্যটননির্ভর এলাকাগুলোতে অস্থায়ীভাবে যৌন বাজার গড়ে ওঠার প্রবণতাও দেখা যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার পরিবেশ স্বাভাবিকীকরণের দিকে ধাবিত হয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে এসব কার্যক্রম ফাহিশা (অশ্লীলতা), জুলুম এবং স্পষ্ট হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তোমরা অশ্লীলতার নিকটেও যেও না” (সূরা আল-ইসরা: ৩২)
অতএব, এমন পরিবেশে অংশগ্রহণ, সমর্থন প্রদান বা ইচ্ছাকৃতভাবে তা উপভোগ করা একজন মুসলিমের জন্য বৈধ হতে পারে না।
৫. জুয়া, মদ ও পাপাচারের সামাজিক বিস্তার
বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে জুয়া, বেটিং, মদ্যপান ও অশ্লীল বিনোদন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এটি শুধু ব্যক্তিগত পাপ নয়; বরং সমাজে গুনাহকে স্বাভাবিকীকরণ করে দেয়। এমন পরিবেশ মুসলিম সমাজের ঈমানি পরিবেশকে দুর্বল করে এবং ধীরে ধীরে হারামকে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
৬. বাংলাদেশে বিদেশি পতাকা প্রদর্শন ও আবেগের অন্ধ অনুসরণ
বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে বিভিন্ন দেশের পতাকা ঘরবাড়ি, দোকানপাট, যানবাহন ও রাস্তাঘাটে প্রদর্শন করা হয়। অনেক সময় এটি নিছক খেলার সমর্থনের সীমা অতিক্রম করে অন্ধ আবেগ, উন্মাদনা ও বিদেশি জাতিসত্তার প্রতি অস্বাভাবিক আসক্তির রূপ ধারণ করে।
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এটি গভীর উদ্বেগের বিষয়। একজন মুসলিমের সর্বপ্রথম পরিচয় তার ঈমান ও ইসলাম। অথচ দেখা যায়, বিশ্বকাপের মৌসুমে অনেক মুসলিম দূরবর্তী অমুসলিম রাষ্ট্রের পতাকা নিয়ে গর্ববোধ করে, তাদের বিজয়ে উল্লাস করে এবং তাদের জাতীয় প্রতীককে নিজের পরিচয়ের অংশ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। এটি মুসলিমের আত্মমর্যাদা ও স্বতন্ত্র ইসলামী পরিচয়ের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়।
এ ধরনের আচরণ অনেক তাশাব্বুহ (অমুসলিমদের অনুকরণ)-এর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ»
“যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।” সুনানে আবু দাউদ ৪০৩১
সারকথা হলো, বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে যে উন্মাদনা সৃষ্টি হয়, তার সঙ্গে বহু শরিয়তবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকে। অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, জুয়া, মদ্যপান, গান-বাজনা, নামাজে অবহেলা, বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণ এবং অন্যান্য মুনকার কাজ এই আয়োজনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। একজন মুসলিমের জন্য এসব কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা যেমন বৈধ নয়, তেমনি এগুলোকে সমর্থন করা, প্রচার করা বা এগুলো নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করাও ঈমানের জন্য অত্যন্ত ভয়ংকর বিষয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
إِذَا عُمِلَتِ الْخَطِيئَةُ فِي الْأَرْضِ، كَانَ مَنْ شَهِدَهَا فَكَرِهَهَا كَمَنْ غَابَ عَنْهَا، وَمَنْ غَابَ عَنْهَا فَرَضِيَهَا كَانَ كَمَنْ شَهِدَهَا
“জমিনের কোথাও যখন কোনো গুনাহ সংঘটিত হয়, তখন যে ব্যক্তি তা দেখে ঘৃণা করে, সে যেন সেখানে উপস্থিতই ছিল না। আর যে ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত না থেকেও তাতে সন্তুষ্ট থাকে, সমর্থন করে সে যেন সেখানে উপস্থিত ছিল।” সুনানে আবূ দাউদ, ৪৩৪৫, তাবারানী ১৭/১৩৯, হাদীস ৩৪৫,
অতএব, একজন মুমিনের কর্তব্য হলো বিশ্বকাপ-উন্মাদনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মুনকার ও পাপাচারকে সমর্থন না করা, বরং তা থেকে নিজেকে দূরে রাখা এবং অন্তর দিয়ে ঘৃণা করা। কারণ গুনাহের আসরে উপস্থিত না থাকলেও, তাতে সন্তুষ্ট থাকা মানুষকে সেই গুনাহের অংশীদার বানিয়ে দিবে।
খেলা দেখা : একটি প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্ন : আমি একজন সাধারণ মুসলিম। সকল গুনাহ ও গর্হিত কাজ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করি। খেলাকে কেন্দ্র করে যেসব পাপাচার হয়ে থাকে তার কোনোটার সাথেই আমার সর্ম্পক নেই। এমনকি খেলাকে শুধু খেলা হিসেবেই বিবেচনা করি, এটাকে যিন্দেগীর মাকসাদ মনে করি না। এ অবস্থায় আমার জন্য খেলা দেখা জায়েয হবে কি?
উত্তর : অন্তত পর্দাহীনতার গুনাহ ছাড়া বর্তমান যুগে খেলা দেখা কিভাবে সম্ভব? এরপরও যদি আপনার কথা মেনে নেওয়া হয়, তবুও এখন দুই কারণে কারো জন্য খেলা দেখা বৈধ নয়।
১. এতে সময়ের অপচয় হয়। আর সময়ের অপচয় করা গুনাহ। হাশরের ময়দানে যেসব প্রশ্নের জবাব দেওয়া ছাড়া কদম নড়ানো যাবে না তার একটি হল সময়। কোথায় কীভাবে তা ব্যয় হয়েছে-এ সম্পর্কে জবাব দিতে হবে। যদি দ্বীন বা দুনিয়ার কোনোও কল্যাণে তা ব্যয় না হয়ে থাকে তাহলে জবাব দেওয়া সম্ভব হবে না।
২. খেলা এখন যে পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং এর সাথে যত পাপাচার ও বেহায়াপনা যুক্ত হয়েছে তাতে আল্লাহর কাছে দায়মুক্তির জন্য অবশ্যই কথা ও কাজে খেলার সাথে সর্বপ্রকার সম্পর্কহীনতা পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করা আবশ্যক। যে কারো দল ভারি করে সে তাদের মধ্যেই গণ্য হয়।
তাই যারা আল্লাহকে ভয় করি, আখিরাতের ফিকির করি, আল্লাহর সামনে হাজির হওয়ার উপর ঈমান রাখি আমাদেরকে অবশ্যই এ খেলা দেখা থেকে বিরত থাকতে হবে। আল্লাহ তাওফীক দান করুন। আমীন।
উত্তর প্রদানে, মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক হাফিজাহুল্লাহ || রবিউল আখির ১৪৩২| মার্চ-২০১১
অমুসলিম খেলোয়াড়দের নামযুক্ত ফুটবল জার্সি পরা কি বৈধ?
উত্তরঃ ফুটবল জার্সিতে কার নাম লেখা আছে, তা মুসলিমের নাম হোক বা অন্য কারো—এ ধরনের জার্সি পরিধান করা জায়েয নয়।
কারণ, ফুটবল জার্সিতে থাকা নাম ও লোগো বাণিজ্যিক ক্রীড়াজগতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর এ ক্রীড়াজগতে বহু অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড বিদ্যমান। সুতরাং এসব জার্সি ক্রয় করা ও পরিধান করা গুনাহের কাজে সহযোগিতা করার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—“তোমরা পাপের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।” সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:২,
ASK IMAM – Islamic Q&A with Mufti Ebrahim Desai || Fatwa No: 19261, Darul Iftaa Durban
মুফতি ইবরাহিম দেশাই দেওবন্দি রহ.
দারুল ইফতা ৩৫ ক্যান্ডেলা রোড, ডারবান, দক্ষিণ আফ্রিকা।
