Notification texts go here Contact Us Download Now!
Posts

আমার সুলতান - আমির হামজা

সময়ের প্রয়োজনে স্মৃতিচারণ ২য় সংস্করণ

পতনের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রহরী 

অন্যান্য সুলতানদের থেকে সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদকে আমার বেশি পছন্দ করার একটি বড় কারণ হলো তিনি এমন এক সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন, যখন উসমানীয় সাম্রাজ্য ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময়ের মুখোমুখি। সাম্রাজ্যের চারদিক তখন ভেঙে পড়ছে। বাইরে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর চাপ, ভিতরে বিদ্রোহ, ঋণ, ষড়যন্ত্র, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, প্রশাসনিক দুর্বলতা সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ অবস্থা। এমন সময়ে সিংহাসনে বসা কোনো গৌরবের বিষয় ছিল না; বরং সেটি ছিল আগুনের ভেতর দাঁড়িয়ে একটি ভেঙে পড়া প্রাসাদ ধরে রাখার মতো।

এই জায়গাতেই সুলতান আব্দুল হামিদ অন্যদের থেকে আলাদা। তিনি বিজয়ের যুগের সুলতান ছিলেন না, তিনি ছিলেন পতনের মুখে দাঁড়িয়ে শেষ প্রতিরোধ গড়ে তোলা একজন সুলতান। তার হাতে যখন ক্ষমতা আসে, তখন সাম্রাজ্য আর সেই আগের উসমানীয় সাম্রাজ্য নেই। যে সাম্রাজ্য একসময় ইউরোপের হৃদয়ে কাঁপন ধরাত, সেই সাম্রাজ্য তখন ইউরোপীয় শক্তিগুলোর হিসাব-নিকাশের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা অপেক্ষা করছিল কখন এই বৃদ্ধ সাম্রাজ্য পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, আর তারা ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নেয়।

এই অবস্থায় আব্দুল হামিদ শুধু একজন শাসক ছিলেন না। তিনি ছিলেন এক প্রহরী। এমন এক প্রহরী, যিনি জানতেন দুর্গের দেয়াল দুর্বল, সৈন্য কম, ভিতরে বিশ্বাসঘাতক আছে, বাইরে শত্রু প্রস্তুত তবু তিনি দরজা খুলে দেননি। তিনি শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে চেয়েছিলেন।

আমরা অনেক সময় ইতিহাসকে খুব সহজ করে দেখি। কাউকে ভালো, কাউকে খারাপ। কাউকে নায়ক, কাউকে খলনায়ক বানিয়ে ফেলি। কিন্তু উসমানীয় সাম্রাজ্যের শেষ সময়কে এভাবে বিচার করা যায় না। বিশেষ করে সুলতান আব্দুল হামিদের সময়কে তো নয়ই। কারণ তার সময়টা ছিল এমন, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত ছিল কঠিন, প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল ঝুঁকিপূর্ণ, আর প্রতিটি ভুলের মূল্য ছিল পুরো সাম্রাজ্যের জন্য ভয়াবহ।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি কঠোর ছিলেন। বিরোধীদের দমন করেছেন। সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ করেছেন। রাজনৈতিক স্বাধীনতা সীমিত করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো যে সাম্রাজ্যের ভিতরে তখন বিদেশি শক্তির এজেন্ট, বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, সামরিক ষড়যন্ত্র এবং ইউরোপীয় কূটচাল একসাথে কাজ করছিল, সেখানে তিনি কীভাবে শাসন করতেন? তিনি কি একেবারে খোলা স্বাধীনতা দিয়ে সাম্রাজ্যকে আরও দ্রুত ভেঙে পড়তে দিতেন? নাকি কঠোর হাতে অন্তত কিছুদিন হলেও ধরে রাখার চেষ্টা করতেন?

আমি বলছি না, তার সব সিদ্ধান্ত নিখুঁত ছিল। কোনো মানুষই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু যেই সময় তিনি পেয়েছিলেন, যেই অবস্থায় তিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন, সেটি বুঝলে তার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। তখন বোঝা যায়, তিনি শুধু ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা একজন শাসক ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন সাম্রাজ্যের শেষ শক্তিশালী প্রতিরোধগুলোর একজন।

তার সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল মুসলিম বিশ্বের ঐক্য। যখন ইউরোপীয় শক্তিগুলো মুসলিম ভূখণ্ডগুলোকে একে একে গ্রাস করছিল, তখন তিনি খেলাফতের মর্যাদাকে আবার রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, উসমানীয় সাম্রাজ্যের সামরিক শক্তি আগের মতো নেই, অর্থনীতি দুর্বল, প্রশাসন চাপে। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের হৃদয়ে এখনও খেলাফতের প্রতি ভালোবাসা আছে। তাই তিনি ভারত থেকে আরব, আফ্রিকা থেকে মধ্য এশিয়া সব জায়গার মুসলমানদের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করার চেষ্টা করেন।

এই জায়গাটাই তার রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। তিনি জানতেন, সাম্রাজ্য শুধু কামান-বন্দুক দিয়ে টিকবে না। টিকবে বিশ্বাস, ঐক্য ও পরিচয়ের মাধ্যমে। তাই তার শাসনামলে ইসলামি পরিচয় ও খেলাফতের মর্যাদা নতুন করে গুরুত্ব পায়।

কিন্তু ইতিহাসের নির্মমতা হলো যারা তার সময় তাকে বুঝতে পারেনি, তারাই পরে তার অনুপস্থিতিতে তার প্রয়োজন অনুভব করেছে।

সুলতান আব্দুল হামিদের পতনের পর উসমানীয় সাম্রাজ্য আর কখনো আগের মতো দাঁড়াতে পারেনি। যারা মনে করেছিল, তাকে সরিয়ে দিলে সাম্রাজ্য মুক্ত হবে, উন্নত হবে, শক্তিশালী হবে তারা খুব দ্রুতই বুঝতে পারে, সমস্যার মূল শুধু একজন সুলতান ছিলেন না। সমস্যা ছিল আরও গভীরে। সাম্রাজ্যের ভিতরটা তখন এতটাই দুর্বল হয়ে গিয়েছিল যে, আব্দুল হামিদের মতো একজন সতর্ক ও কৌশলী শাসক ছাড়া সেটিকে সামলে রাখা প্রায় অসম্ভব ছিল।

এখানেই আসে রিজা তেভফিক বেয়ের অনুশোচনার বিষয়টি।

রিজা তেভফিক বে ছিলেন সুলতান আব্দুল হামিদের কট্টর বিরোধীদের একজন। তিনি ইউনিয়নবাদী চিন্তাধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অর্থাৎ তিনি সেই ধারার মানুষদের একজন, যারা মনে করতেন আব্দুল হামিদ সাম্রাজ্যের অগ্রগতির পথে বাধা। তারা ভাবতেন, সুলতানকে সরিয়ে দিলে নতুন যুগ শুরু হবে। কিন্তু ইতিহাস সবসময় মানুষের প্রত্যাশামতো চলে না।

সুলতানের পতনের পর যখন সাম্রাজ্যের অবস্থা আরও করুণ হতে থাকে, যখন একের পর এক বিপর্যয় নেমে আসে, তখন অনেকের চোখ খুলতে শুরু করে। রিজা তেভফিকও তাদের একজন। তিনি বুঝতে পারেন, যাকে তারা এতদিন দোষারোপ করেছিলেন, তিনি আসলে পতনের কারণ ছিলেন না। বরং পতনকে বিলম্বিত করে রাখা এক শক্তিশালী দেয়াল ছিলেন।

এই অনুশোচনা থেকেই তিনি রচনা করেন “সুলতান আব্দুল হামিদ হানের রুহানিয়্যেত থেকে ইস্তিমদাদ”।


"কোথায় আপনি, মহান সুলতান হামিদ খান?

আমার আর্তনাদ কি পৌঁছাবে আপনার নিকটে?

মৃত্যুর ঘুম থেকে এক মুহূর্তের জন্য জেগে ওঠেন..."

- রিজা তেভফিক বে


এই কবিতাটি শুধু একটি কবিতা নয়। এটি ইতিহাসের এক স্বীকারোক্তি। একজন বিরোধীর পক্ষ থেকে পরাজিত সত্যের সামনে মাথা নত করা। একজন মানুষের নিজের ভুল বুঝতে পারার দলিল। এই কবিতার গুরুত্ব এখানেই যে, এটি কোনো সাধারণ প্রশংসা নয়। এটি এসেছে এমন একজনের কলম থেকে, যিনি একসময় সুলতানের বিরোধিতা করেছিলেন।

মানুষ যখন শত্রুর প্রশংসা করে, তখন সেই প্রশংসার ওজন আলাদা হয়। কারণ সেখানে অন্ধ ভক্তি থাকে না। থাকে অভিজ্ঞতা, ভুল, অনুশোচনা এবং উপলব্ধির ভার।

রিজা তেভফিকের এই অনুশোচনা আসলে শুধু একজন মানুষের অনুশোচনা নয়। এটি একটি প্রজন্মের অনুশোচনা। যারা আব্দুল হামিদকে বুঝতে পারেনি, যারা ভেবেছিল তাকে সরালেই সব ঠিক হয়ে যাবে, তারা পরে দেখল যে মানুষটিকে তারা অন্ধকার ভেবেছিল, তিনি আসলে ঝড়ের মধ্যে শেষ প্রদীপটি ধরে রেখেছিলেন।

উসমানীয় সাম্রাজ্যের শেষ অধ্যায়ে আরেকটি বড় বিতর্কিত চরিত্র হলেন মুস্তাফা কামাল পাশা। তার নাম এলে ইতিহাস দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। কেউ তাকে আধুনিক তুরস্কের রক্ষক বলেন, কেউ তাকে খেলাফত ধ্বংসের প্রধান চরিত্র হিসেবে দেখেন। আসলে কামাল পাশাকে বুঝতেও একইভাবে জটিল ইতিহাসের ভিতরে প্রবেশ করতে হয়।

সুলতান মেহমেদ ষষ্ঠ কামাল পাশাকে সামসুনে পাঠিয়েছিলেন বিদ্রোহ দমনের জন্য। কিন্তু সেখানে গিয়ে কামাল পাশা উল্টো জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতৃত্ব নেন। তিনি প্রতিরোধকে সংগঠিত করেন। এখান থেকেই শুরু হয় নতুন তুর্কি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের শক্তিশালী অধ্যায়।

এখন প্রশ্ন হলো এটা কি বিদ্রোহ ছিল, নাকি জাতিকে রক্ষার উদ্যোগ ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর একরকম নয়। যারা খেলাফত ও সাম্রাজ্যের ধারাবাহিকতাকে গুরুত্ব দেন, তাদের কাছে এটি ছিল বিদ্রোহ। আর যারা তুর্কি জাতিরাষ্ট্রের জন্মকে কেন্দ্র করে ইতিহাস দেখেন, তাদের কাছে এটি ছিল মুক্তির সূচনা।

কামাল পাশাকে এককভাবে সাম্রাজ্য ধ্বংসের জন্য দায়ী করা যায় না। কারণ সাম্রাজ্য তার আগেই বহু দিক থেকে ভেঙে পড়েছিল। অর্থনীতি দুর্বল ছিল, সামরিক শক্তি ক্ষয়প্রাপ্ত ছিল, ইউরোপীয় শক্তিগুলো আগেই ভাগ-বাঁটোয়ারার পরিকল্পনা করছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সাম্রাজ্য প্রায় অচল হয়ে পড়েছিল। তাই সব দায় একজন মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ইতিহাসের সহজীকরণ হবে।

কিন্তু এটাও সত্য, কামাল পাশার কিছু সিদ্ধান্ত মুসলিম বিশ্বের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। তিনি চাইলে হয়তো ব্রিটেনের মতো সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের কোনো মডেল রাখতে পারতেন। সুলতান বা খলিফাকে শুধু প্রতীকী মর্যাদায় রেখে নতুন রাষ্ট্র গঠন করা যেত। এতে তুরস্কও বাঁচত, আবার মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের প্রতীকটিও পুরোপুরি ভেঙে পড়ত না।

কিন্তু তিনি সেই পথ নেননি। তিনি খেলাফত সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করেন। আর এই সিদ্ধান্ত মুসলিম বিশ্বের বহু মানুষের কাছে ছিল এক ভয়াবহ আঘাত। কারণ খেলাফত তখন শুধু একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ছিল না; এটি ছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতীক। সেই প্রতীক যখন ভেঙে দেওয়া হলো, তখন শুধু তুরস্কের ইতিহাস বদলায়নি পুরো মুসলিম বিশ্বের মানসিক মানচিত্র বদলে গেল।

তারপর একের পর এক সংস্কার আসে। শরিয়াভিত্তিক আদালত বিলুপ্ত করা হয়। ফেজ বা কায়ী টুপি নিষিদ্ধ করা হয়। ইউরোপীয় ধাঁচের টুপি বাধ্যতামূলক করা হয়। আরবি লিপির বদলে লাতিন বর্ণমালা প্রবর্তন করা হয়। এসব সিদ্ধান্ত শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন ছিল না। এগুলো ছিল একটি জাতির অতীতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার মতো।

লিপি পরিবর্তনের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। ভাষা একটি জাতির স্মৃতি বহন করে। আর লিপি সেই স্মৃতির দরজা। আরবি লিপি থেকে লাতিন বর্ণমালায় পরিবর্তনের ফলে নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে নিজেদের পুরনো দলিল, সাহিত্য, ইতিহাস ও ধর্মীয় ঐতিহ্য থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। আজও তুর্কি জাতি সেই বিচ্ছেদের খেসারত কোনো না কোনোভাবে বয়ে বেড়াচ্ছে।

তবে কামাল পাশার বিষয়ে বিচার করতে গেলে এটাও বলতে হয় তিনি তুরস্ককে এক অর্থে বাঁচিয়েছিলেন। বিদেশি শক্তির দখল, ভাঙন এবং অপমানের মুখে তিনি একটি নতুন রাষ্ট্র দাঁড় করিয়েছিলেন। এই দিক থেকে তিনি প্রশংসিত। কিন্তু সেই রাষ্ট্র দাঁড় করানোর পথে তিনি যে ইসলামী ঐতিহ্য, খেলাফত এবং উম্মাহর রাজনৈতিক ঐক্যের প্রতীককে ভেঙে দিলেন এই জায়গাতেই তিনি মুসলিম বিশ্বের একটি বড় অংশের কাছে ঘৃণিত।

তাই ইতিহাসে কামাল পাশা একইসাথে প্রশংসিত এবং ঘৃণিত। তিনি তুরস্কের রক্ষক, আবার খেলাফতের অবসানের নায়কও। তিনি জাতীয়তাবাদী নেতা, আবার মুসলিম ঐক্যের ভাঙনের প্রতীকও। এই দ্বৈত অবস্থান থেকেই তাকে বিচার করতে হয়।

অন্যদিকে সুলতান আব্দুল হামিদ ছিলেন ঠিক বিপরীত ধারার মানুষ। তিনি জানতেন সাম্রাজ্য দুর্বল, কিন্তু তিনি অতীতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাননি। তিনি জানতেন সংস্কার দরকার, কিন্তু নিজের শেকড় কেটে ফেলে নয়। তিনি আধুনিক প্রযুক্তি, রেলপথ, যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষা এসবের গুরুত্ব বুঝতেন; কিন্তু সেগুলো গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন ইসলামী পরিচয় ধরে রেখে।

এই জায়গায় তার বিশেষত্ব। তিনি অন্ধভাবে পশ্চিমকে অনুসরণ করতে চাননি। আবার আধুনিকতার দরজাও বন্ধ করে দেননি। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক পথ, যেখানে উসমানীয় সাম্রাজ্য আধুনিক হবে, কিন্তু আত্মপরিচয় হারাবে না। আজকের মুসলিম বিশ্বের জন্য এই চিন্তাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ মুসলিম সমাজের বড় সংকট এখানে আমরা হয় অতীত আঁকড়ে ধরে বর্তমানকে অস্বীকার করি, না হয় আধুনিকতার নামে নিজেদের শেকড় কেটে ফেলি। আব্দুল হামিদ এই দুইয়ের মাঝামাঝি একটি পথ খুঁজেছিলেন। হয়তো তিনি পুরোপুরি সফল হননি, কিন্তু তার চেষ্টা ছিল ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তার পতনের পর যারা ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নেয়, তারা ভেবেছিল নতুন যুগ আসবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সাম্রাজ্যের পতন আরও দ্রুত এগিয়ে যায়। বলকান হারায়, আরব অঞ্চল বিচ্ছিন্ন হয়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে, আর শেষে খেলাফতও বিলুপ্ত হয়।

তখনই বোঝা যায়, আব্দুল হামিদ শুধু একজন সুলতান ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি যুগের শেষ রক্ষাকবচ।

রিজা তেভফিকের কবিতা এই উপলব্ধিরই ভাষা। সেখানে একজন মানুষ ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ভুল স্বীকার করেছেন। তিনি যেন বলতে চেয়েছেন আমরা বুঝিনি, আমরা ভুল করেছি, আমরা যাকে সরিয়েছি, তিনিই হয়তো শেষ দেয়াল ছিলেন।

এই কবিতাটি তাই শুধু সাহিত্য নয়; এটি রাজনৈতিক অনুশোচনা, ঐতিহাসিক স্বীকারোক্তি এবং এক হারানো যুগের প্রতি আর্তনাদ।

আজ যখন আমরা সুলতান আব্দুল হামিদকে স্মরণ করি, তখন তাকে শুধু একজন অতীতের শাসক হিসেবে দেখা উচিত নয়। তাকে দেখতে হবে এমন একজন নেতা হিসেবে, যিনি এক অসম্ভব সময়ে অসম্ভব দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলেন। তিনি এমন সময় সাম্রাজ্য ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন, যখন চারদিক থেকে সবকিছু ভেঙে পড়ছিল।

আর এই কারণেই অন্যান্য সুলতানদের তুলনায় তিনি আমার কাছে বেশি প্রিয়। কারণ বিজয়ের সময় নেতৃত্ব দেওয়া সহজ, কিন্তু পতনের সময় দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন। শক্তিশালী সাম্রাজ্য পরিচালনা করা এক বিষয়, আর ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়ানো সাম্রাজ্যকে ধরে রাখা আরেক বিষয়। আব্দুল হামিদ দ্বিতীয় এই দ্বিতীয় কাজটি করেছিলেন।

তিনি হয়তো সাম্রাজ্যকে শেষ পর্যন্ত বাঁচাতে পারেননি, কিন্তু তিনি সাম্রাজ্যের পতন বিলম্বিত করেছিলেন। তিনি মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের স্বপ্ন ধরে রেখেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, খেলাফত শুধু ইস্তাম্বুলের সিংহাসনের বিষয় নয়। এটি ভারত, আরব, আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া সব জায়গার মুসলমানদের হৃদয়ের সঙ্গে জড়িত।

তাই তার পতন শুধু একজন সুলতানের পতন ছিল না। এটি ছিল মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাসের এক বড় ধাক্কা। আর খেলাফতের বিলুপ্তি ছিল সেই ধাক্কার চূড়ান্ত পরিণতি।

ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম দিক হলো অনেক সময় মানুষ সত্যকে বুঝতে পারে তখন, যখন তা হারিয়ে যায়। আব্দুল হামিদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। জীবিত অবস্থায় যাকে অনেকে স্বৈরাচার বলেছে, মৃত্যুর পর বা পতনের পর তারাই বুঝেছে, তিনি আসলে কত বড় বিপর্যয় ঠেকিয়ে রেখেছিলেন।

এই অধ্যায়ের শেষে এসে তাই বলা যায় সুলতান আব্দুল হামিদ ছিলেন এমন এক সুলতান, যাকে বুঝতে হলে শুধু তার আদেশ, আইন বা কঠোরতা দেখতে হবে না; দেখতে হবে তার সময়কে। দেখতে হবে তার চারপাশের ষড়যন্ত্র, সাম্রাজ্যের দুর্বলতা, ইউরোপীয় শক্তির লোভ, জাতীয়তাবাদের আগুন এবং মুসলিম বিশ্বের ভাঙনের ভয়।

আর কামাল পাশাকে বুঝতে হলে দেখতে হবে তিনি তুরস্ককে বাঁচিয়েছিলেন, কিন্তু উম্মাহর ঐতিহাসিক ঐক্যের প্রতীককে ভেঙে দিয়েছিলেন। তাই তিনি ইতিহাসে একইসাথে প্রশংসিত এবং বিতর্কিত।

কিন্তু আব্দুল হামিদের ব্যাপারে সময় যেন ধীরে ধীরে একটি কথাই বলছে তিনি ভুল বোঝা এক সুলতান ছিলেন।

তিনি পতনের কারণ ছিলেন না। বরং পতনকে আটকে রাখা শেষ শক্তিগুলোর একজন ছিলেন।

আর রিজা তেভফিকের অনুশোচনার কবিতা সেই সত্যেরই এক ব্যথিত স্বীকারোক্তি।

"কোথায় আপনি, মহান সুলতান হামিদ খান?

আমার আর্তনাদ কি পৌঁছাবে আপনার নিকটে?

মৃত্যুর ঘুম থেকে এক মুহূর্তের জন্য জেগে ওঠেন...


এই ইতিহাসের গভীরে যেতে হলে পড়তে হবে সময়ের প্রয়োজনে স্মৃতিচারণ (দ্বিতীয় সংস্করণ) আমির হামজা বাঁধন। বইটির প্রি-অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন


© সর্বস্তরের সংরক্ষিত। প্রকাশক ও লেখকের অনুমতি ব্যতীত প্রচার ও প্রিন্ট সম্পূর্ণ নিষেধ।

Cookie Consent
We serve cookies on this site to analyze traffic, remember your preferences, and optimize your experience.
Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
Site is Blocked
Sorry! This site is not available in your country.