![]() |
| সাম্প্রতিক সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত প্রোগ্রামে ঘরের বাজারের কর্ণধার ও বাংলাদেশের স্বনামধন্য আলেম ও বক্তা জামশেদ মজুমদার। |
জামশেদ মজুমদার একেবারে আলেম সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন—ব্যবসা করে স্বাবলম্বী হওয়া যায়, আবার একই সাথে দ্বীনেরও খেদমত করা যায়।
বর্তমান আলেম সমাজের একটা প্রথা হয়ে গেছে—কোনোমতে পড়াশোনা পাস করেই অধিকাংশ হয় বক্তা, আর অধিকাংশ না হয় একটা মাদ্রাসা খুলে বসে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই মাদ্রাসা চালানোর মতো তার আসলে কতটুকু শিক্ষাগত যোগ্যতা আছে? কতটুকু অভিজ্ঞতা আছে?
আমি আবার মাদ্রাসা শিক্ষার বিরুদ্ধে যাচ্ছি না। মাদ্রাসার প্রয়োজন আছে, অবশ্যই আছে। বরং একটি ভালো মাদ্রাসা একটা সমাজের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু মাদ্রাসা হতে হবে যোগ্যতার ভিত্তিতে। ব্যাঙের ছাতার মতো যেখানে-সেখানে অযোগ্য লোকজন মাদ্রাসা খুলে বসলে এর বিরূপ প্রভাব সমাজের ওপর পড়বেই।
কারণ একটা মাদ্রাসা শুধু একটা বিল্ডিং, কয়েকজন শিক্ষক আর কিছু ছাত্রের সমষ্টি নয়। একটা মাদ্রাসা থেকে ভবিষ্যতের আলেম তৈরি হয়। সেই আলেমরা পরবর্তীতে সমাজের মানুষকে দ্বীনের কথা বলবে, মানুষ তাদের অনুসরণ করবে। সুতরাং যারা মাদ্রাসা পরিচালনা করবেন, তাদের যোগ্যতা, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং দায়িত্ববোধ থাকা অত্যন্ত জরুরি।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মাদ্রাসাকে ঘিরে যেসব কর্মকাণ্ড ও অভিযোগ আমরা দেখছি, সেগুলো নিয়ে আর নাই বা বললাম।
মাদ্রাসা করলে মাদ্রাসার মতো করা উচিত। আমাদের দেশে এমন অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলো বছরের পর বছর ধরে মানসম্মত দ্বীনি শিক্ষা দিয়ে আসছে। যেমন—আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম, হাটহাজারী; জামিয়া কুরআনিয়া আরাবিয়া, লালবাগ; জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া তথা ইউনুসিয়া মাদ্রাসা; জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম মাদানিয়া, যাত্রাবাড়ী; বারিধারা জামিয়া রহমানিয়া—এমন অসংখ্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
এসব প্রতিষ্ঠানে অসংখ্য শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে আলেম হয়ে বের হচ্ছেন এবং একটি নির্দিষ্ট মানের শিক্ষা পাচ্ছেন। দেশের মুসলমানরা এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে ইনশাআল্লাহ।
তাহলে প্রশ্ন হলো—দেশে যখন এতগুলো ভালো দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তখন নতুন করে যারা মাদ্রাসা খুলছেন, তাদের প্রত্যেকের যোগ্যতা ও উদ্দেশ্য নিয়ে কি একটু চিন্তা করা উচিত নয়।
বাস্তবতা হলো, নতুন করে যারা মাদ্রাসা করছেন, তাদের অনেকেরই পর্যাপ্ত দ্বীনি শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই। খবর নিয়ে দেখবেন, অনেকেই দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত পড়াশোনা করেননি, অথচ তারা এখন একটি মাদ্রাসার পরিচালক! মাদ্রাসা করলেই তো আর যে কেউ মাদ্রাসা চালানোর যোগ্য হয়ে যায় না।
যাইহোক, কথা বলতে বলতে অন্যদিকে চলে গেলাম। 😅
আমি মূলত যে কথাটা আপনাদের বোঝাতে চাচ্ছি, সেটা হলো—পড়াশোনা শেষ করে মাদ্রাসা কেন্দ্রিক কিংবা মসজিদ কেন্দ্রিক হয়ে থাকাটাই জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয়। দ্বীনের খেদমত করতে হলে অবশ্যই মাদ্রাসা বা মসজিদে থাকতে হবে—এমন কোনো কথা নেই।
ব্যবসা করা যায়। চাকরি করা যায়। উদ্যোক্তা হওয়া যায়। নিজের একটা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানো যায়। আর নিজের অবস্থান থেকে দ্বীনের খেদমতও করা যায়।
বরং একজন আলেম যদি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারেন, তাহলে তিনি অনেক বেশি স্বাধীনভাবে দ্বীনের খেদমত করতে পারবেন।
আরেকটা বিষয় মাঝে মাঝে দেখি—মসজিদের ইমামরা বেতন কম থাকার কারণে আন্দোলন করেন। ভাই, অবশ্যই একজন ইমামের ন্যায্য সম্মানী পাওয়া উচিত। তার শ্রম ও দায়িত্বের যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া উচিত। কিন্তু তুমি শুধু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়াবা আর বেতন নিবা—এটাই কেন একমাত্র ব্যবস্থা হতে হবে?
তুমি নামাজের পাশাপাশি ব্যবসা করতে পারো না?
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়াতে দিনের কতটুকু সময় লাগে? বাকি সময়টা বসে না থেকে কোনো হালাল ব্যবসা করলে তো নিজেরও একটা ইনকাম তৈরি হয়। স্বাবলম্বী হওয়া যায়। তখন বেতন কম-বেশির ওপর এতটা নির্ভর করতে হয় না।
আমাদের আলেমদের শুধু বক্তা হওয়ার চিন্তা না করে স্বাবলম্বী হওয়ার চিন্তাও করা উচিত। ব্যবসা করা, চাকরি করা কিংবা উদ্যোক্তা হওয়া কোনোভাবেই দ্বীনের খেদমতের বিপরীত নয়।
ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালেও আমরা দেখতে পাই, মুসলিম সমাজে ব্যবসা-বাণিজ্য ও দ্বীনি জ্ঞান পাশাপাশি চলেছে। তাই আলেম মানেই শুধু মসজিদে ইমামতি করবেন কিংবা মাদ্রাসায় পড়াবেন—এই ধারণা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।
আমাদের দরকার এমন আলেম, যারা শুধু মিম্বরে কথা বলবেন না; যোগ্যতায় আলেম হবেন, কাজে দক্ষ হবেন, নিজের পায়ে দাঁড়াবেন এবং সমাজের জন্যও কিছু করবেন।
সবশেষে আবারও বলি—বিষয়টা মাদ্রাসার বিরুদ্ধে না, আলেমদের বিরুদ্ধেও না। বরং মাদ্রাসা শিক্ষা আমাদের সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই শিক্ষা ব্যবস্থাকে মানসম্মত করতে হবে, যোগ্য মানুষের হাতে দিতে হবে এবং মাদ্রাসা পরিচালনাকে শুধু একটা আবেগের বিষয় না বানিয়ে দায়িত্বের বিষয় হিসেবে দেখতে হবে।
একইভাবে আলেমদেরও চিন্তা করতে হবে—শুধু বক্তৃতা, ইমামতি কিংবা মাদ্রাসার ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজেদের স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করতে হবে।
যোগ্যতা, শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও স্বাবলম্বিতা—এই চারটি বিষয় যদি আমাদের আলেম সমাজের মধ্যে আরও শক্তভাবে আসে, তাহলে শুধু আলেম সমাজ নয়, পুরো মুসলিম সমাজই উপকৃত হবে।
