![]() |
এটা কি শুধুই একটি পতাকা?
এটা কি শুধুই আবেগ?
এটা কি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতীক?
নাকি এটি কারও একক সম্পত্তি?"
যারা ইতিহাস পড়েনি, তারা হয়তো বলবে "হ্যাঁ, এটা তো শুধু একটা পতাকা।"
কিন্তু ইতিহাস চিৎকার করে বলে না!
একজন মুসলমানের কাছে কালেমা কেবল কিছু আরবি শব্দ নয়। এটি তার ঈমানের ঘোষণা। আর সেই ঈমানের মর্যাদা বহনকারী পতাকা কখনোই নিছক রঙিন কাপড়ের টুকরো ছিল না। এর ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে শাহাদাতের সুবাস, সাহসের মহাকাব্য, আত্মত্যাগের অমর ইতিহাস।
ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখুন...
মুতার উত্তপ্ত প্রান্তরে যখন রোমান সাম্রাজ্যের বিশাল বাহিনীর সামনে মুসলিম সেনারা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল, তখন যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু ছিল শুধু বিজয় নয় পতাকার মর্যাদা।
প্রথমে পতাকা হাতে এগিয়ে গেলেন হযরত যায়েদ ইবনে হারিসা (রা.)। তিনি শহীদ হলেন, কিন্তু পতাকা পড়তে দিলেন না।
এরপর পতাকা তুলে নিলেন হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রা.)।
একটি হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল...
তিনি অন্য হাতে পতাকা ধরলেন।
সেটিও কেটে ফেলা হলো...
তখন তিনি বুকের সঙ্গে পতাকাকে জড়িয়ে ধরলেন।
শত্রুর তরবারি তাঁর দেহকে ক্ষতবিক্ষত করতে পেরেছিল, কিন্তু তাঁর বুক থেকে পতাকাকে আলাদা করতে পারেনি। তিনি শহীদ হলেন, অথচ পতাকার সম্মান অক্ষুণ্ন রেখে গেলেন। এই আত্মত্যাগের বিনিময়ে আল্লাহ তাঁকে জান্নাতে ডানা দান করলেন। ইতিহাস তাঁকে আজও স্মরণ করে জাফর আত-তাইয়ার নামে।
এরপর এলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.)।
তিনিও পতাকা হাতে নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে গেলেন এবং শাহাদাত বরণ করলেন।
তিনজন সেনাপতি একে একে শহীদ।
মনে হচ্ছিল মুসলিম বাহিনী যেন থেমে যাবে।
ঠিক তখনই সাহাবিদের সর্বসম্মতিক্রমে পতাকা তুলে দেওয়া হলো খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-এর হাতে।
তিনি শুধু একটি পতাকা বহন করেননি; বহন করেছিলেন একটি উম্মাহর আশা।
অতুলনীয় যুদ্ধকৌশলে তিনি বিশাল রোমান বাহিনীকে বিভ্রান্ত করলেন, মুসলিম বাহিনীকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনলেন, আর সেই দিনই ইতিহাস তাঁকে দিল এক অমর পরিচয় "সাইফুল্লাহ" আল্লাহর তরবারি।
কিন্তু ইতিহাস এখানেই শেষ নয়...
শতাব্দী পেরিয়ে এলো ১৪৫৩ সাল।
৫৩ দিনের দীর্ঘ অবরোধ।
অদম্য কনস্টান্টিনোপলের প্রাচীর।
তখন এগিয়ে এলেন এক তরুণ বীর উলুবাতলি হাসান।
হাতে তরবারি, বুকে ঈমান, আর কাঁধে বিজয়ের পতাকা।
শত্রুর তীর তাঁর শরীর ভেদ করছিল।
রক্ত ঝরছিল।
একটি... দুটি... দশটি...
ইতিহাসে বর্ণিত আছে, তাঁর শরীরে অসংখ্য তীর বিদ্ধ হয়েছিল।
তবুও তিনি থামেননি।
তিনি দুর্গের চূড়ায় উঠে পতাকা গেঁথে দিলেন।
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পতাকাকে ধরে রাখলেন, যেন তা মাটিতে না পড়ে।
যখন সেই পতাকা দুর্গের মাথায় উড়তে শুরু করল, তখন উসমানীয় সৈন্যদের হৃদয়ে যেন নতুন প্রাণ সঞ্চার হলো।
আর সেদিনই পতন ঘটল সেই অজেয় নগরীর।
এগুলো কি শুধুই গল্প?
না।
এগুলো এমন ইতিহাস, যা রক্ত দিয়ে লেখা হয়েছে।
তাই আজ যখন কেউ বলে—"এটা তো শুধু একটা পতাকা", তখন ইতিহাস নীরবে প্রশ্ন করে-
যদি শুধু কাপড়ই হতো, তবে জাফর (রা.) কেন দুই হাত হারিয়ে বুক দিয়ে আঁকড়ে ধরেছিলেন?
যদি শুধু প্রতীকই হতো, তবে উলুবাতলি হাসান কেন মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সেটিকে পতিত হতে দেননি?
আজ আমরা দুঃখের সঙ্গে দেখি, কেউ এই পতাকাকে রাজনৈতিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করতে চায়, কেউ বিতর্কের বিষয় বানায়, কেউ আবার এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন এটি তাদের একক মালিকানাধীন প্রতীক।
কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়,
ঈমান কোনো দলের নয়।
তাওহীদ কোনো সংগঠনের নয়।
কালেমা কোনো গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়।
যেখানে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ" উচ্চারিত হয়, সেখানেই একজন মুসলমানের হৃদয় নত হয়ে যায়।
মনে রাখা উচিত, ইসলামের ইতিহাসে বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন রঙ, নকশা ও রাষ্ট্রের পতাকা ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু যে বিষয়টি কখনো পরিবর্তিত হয়নি, তা হলো কালেমার মর্যাদা।
পতাকার রং বদলেছে।
রাষ্ট্র বদলেছে।
সাম্রাজ্য উঠেছে, সাম্রাজ্য ভেঙেছে।কিন্তু "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ"-এর আহ্বান কখনো বদলায়নি।সুতরাং ইতিহাসকে দলীয় রঙে নয়, সত্যের আলোয় পড়ুন।
কারণ...
যে ইতিহাস রক্তে লেখা, তাকে রাজনীতির কালি দিয়ে মুছে ফেলা যায় না।
যে পতাকার মর্যাদায় সাহাবিরা শহীদ হয়েছেন, যে পতাকার সম্মানে বীরেরা প্রাণ উৎসর্গ করেছেন, সেই পতাকার প্রতি সম্মান কোনো ব্যক্তি, কোনো দল বা কোনো রাষ্ট্রের দান নয় এটি ইতিহাসের উত্তরাধিকার, আর সেই উত্তরাধিকার বহন করে পুরো মুসলিম উম্মাহ।
