![]() |
| Ruins of Tungy Bridge |
বাংলার ইতিহাসে এমন বহু স্থাপনা রয়েছে, যেগুলো একসময় মানুষের জীবন, বাণিজ্য ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল, কিন্তু সময়ের নির্মম আঘাতে আজ সেগুলো কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ। টঙ্গী সেতু তারই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। আজকের ব্যস্ত শিল্পনগরী টঙ্গী একসময় ছিল নদীকেন্দ্রিক জনপদ, আর সেই জনপদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ছিল তুরাগ নদীর ওপর নির্মিত একটি বিশাল মুঘল সেতু। এই সেতুর ধ্বংসাবশেষই ১৮২৫ সালে ব্রিটিশ শিল্পী ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা স্যার চার্লস ড'অয়লি তাঁর বিখ্যাত চিত্রে অমর করে রেখেছেন, যার নাম "Ruins of Tungy Bridge"।
ঐতিহাসিক সূত্র থেকে জানা যায়, সপ্তদশ শতাব্দীতে মুঘল সুবাদার মীর জুমলা-এর শাসনামলে তুরাগ নদীর ওপর এই সেতুটি নির্মিত হয়। সে সময় ঢাকা ছিল বাংলার রাজধানী এবং উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান পথগুলোর একটি ছিল টঙ্গী। রাজধানী থেকে ময়মনসিংহ, ভাওয়াল ও উত্তর বাংলার দিকে যাতায়াতকারী ব্যবসায়ী, সৈন্য, রাজকর্মচারী ও সাধারণ মানুষের জন্য এই সেতু ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুঘল শাসকরা শুধু দুর্গ বা প্রাসাদ নির্মাণেই গুরুত্ব দেননি; যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নেও তারা বিশেষ মনোযোগ দিয়েছিলেন। টঙ্গী সেতু সেই পরিকল্পনারই একটি অংশ ছিল।
তৎকালীন সময়ে তুরাগ নদী ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। নদী ও স্থলপথ—দুই ধরনের যোগাযোগের সুবিধা থাকায় টঙ্গী অঞ্চল অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে। সেতুটি ছিল শক্ত ইটের গাঁথুনিতে নির্মিত, যার বিশাল খিলান দূর থেকেই চোখে পড়ত। সমসাময়িক ভ্রমণকারীদের বিবরণ থেকে বোঝা যায়, এটি ছিল সে সময়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য।
কিন্তু ইতিহাসের নিয়মই হলো—যা সৃষ্টি হয়েছে, একদিন তা ক্ষয়ের মুখোমুখি হবেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নদীর প্রবল স্রোত, বর্ষার বন্যা, প্রাকৃতিক ক্ষয় এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেতুটি দুর্বল হয়ে পড়ে। অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগে এসে এর অনেক অংশ ভেঙে যায়। অবশেষে উনিশ শতকের শুরুতে এটি একটি পরিত্যক্ত ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়। মানুষের পদচারণা থেমে যায়, কিন্তু প্রকৃতি তার কাজ থামায়নি। ভাঙা দেয়ালের গায়ে জন্ম নেয় বট ও অশ্বত্থ গাছ, শিকড় জড়িয়ে ধরে ইটের গাঁথুনি। একসময়ের ব্যস্ত সেতুটি ধীরে ধীরে সবুজের আড়ালে হারিয়ে যেতে থাকে।
১৮২৫ সালে চার্লস ড'অয়লি যখন এই ধ্বংসাবশেষের ছবি আঁকেন, তখন তিনি কেবল একটি ভাঙা স্থাপনা আঁকেননি; তিনি তুলে ধরেছিলেন বাংলার অতীতের একটি নীরব স্মৃতি। ছবিতে দেখা যায়, ভেঙে পড়া বিশাল খিলানের নিচ দিয়ে তুরাগ নদীর শান্ত জল বয়ে যাচ্ছে। নদীতে ছোট নৌকা চলছে, মাঝিরা তাদের দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত। অন্যদিকে বিশাল বটগাছের শিকড় সেতুর ইটের দেয়ালকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরেছে যেন প্রকৃতি নিজেই স্থাপনাটিকে নিজের অংশ করে নিয়েছে। ছবির এই বৈপরীত্য—একদিকে মানুষের নির্মাণ, অন্যদিকে প্রকৃতির পুনর্দখল—দর্শককে গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে।
ড'অয়লি তাঁর এই চিত্রটি Antiquities of Dacca গ্রন্থে প্রকাশ করেন। এই গ্রন্থটি শুধু শিল্পকর্মের সংকলন নয়; বরং উনিশ শতকের শুরুর দিকের ঢাকা ও আশপাশের ঐতিহাসিক স্থাপনার একটি মূল্যবান দলিল। আজ টঙ্গী সেতুর ইতিহাস সম্পর্কে আমরা যতটুকু জানি, তার একটি বড় অংশই এই গ্রন্থ এবং সমসাময়িক বিবরণের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমানে সেই ঐতিহাসিক সেতুর প্রায় কোনো দৃশ্যমান অংশ আর অবশিষ্ট নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নদীর গতিপথের পরিবর্তন, আধুনিক সেতু নির্মাণ, নগরায়ণ এবং অবহেলার কারণে ধ্বংসাবশেষও বিলীন হয়ে গেছে। আজ টঙ্গীর ব্যস্ত সড়ক, শিল্পকারখানা ও আধুনিক অবকাঠামোর মাঝে দাঁড়িয়ে কল্পনা করাও কঠিন যে, এখানেই একসময় মুঘল স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল।
"Ruins of Tungy Bridge" তাই শুধু একটি শিল্পচিত্র নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক মূল্যবান দলিল। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় নয়, ইটের গাঁথুনি, নদীর তীর এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যেও বেঁচে থাকে। অতীতকে সংরক্ষণ করতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হারায়। চার্লস ড'অয়লির আঁকা এই চিত্রটি সেই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসেরই এক নীরব, অথচ অমূল্য সাক্ষ্য।
